মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ও জনসম্পৃক্ত আন্দোলনটি সংঘটিত হয় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে। নজিরবিহীন দমন-পীড়নের কারণে কোটা সংস্কারের দাবি রূপ নিয়েছিল এক দফার আন্দোলনে। সেটি ছিল ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগ’। গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনা
আওয়ামী লীগের পতন পর্বের শুরুটা হয়েছিল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর সমালোচনা এবং প্রধান বিরোধী দলগুলোর বয়কটের পরও বিতর্কিত নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় ৭ জানুয়ারি, ২০২৪ সালে। একতরফা এ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবারের মতো নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। যদিও জাতীয় পার্টি ও কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলেন।
দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে প্রায় সব বিরোধী দল ও মতকে কোণঠাসা করতে পেরেছিলেন শেখ হাসিনা। শুধু তা-ই নয়, পরপর প্রশ্নবিদ্ধ তিনটি নির্বাচন করেও তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলেন। ফলে জনমনে এমন একটি ধারণা বা ‘মিথ’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যে, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে কিছুতেই ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না। ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণই যে নিয়ামক শক্তি, এ কথা দেশের মানুষ প্রায় অবিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। জনগণের পাশাপাশি এক যুগ ধরে আন্দোলন ও মামলা-হামলার মুখে থাকা বিএনপির একাংশের মধ্যেও এমন ধারণা বা বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করেছিল। কারণ, একবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে এবং দুবার নির্বাচন বর্জনের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছিল দলটির মধ্যে।
তবে, দোর্দণ্ড প্রতাপে টানা চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ চালানো সেই শেখ হাসিনাকেই ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করতে হয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। ৫ আগস্টের সেই চূড়ান্ত দিনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ গণঅভ্যুত্থান সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি অংশকে প্রবলভাবে ধাক্কা দিয়েছে, অনেক কিছু ভেঙেচুরে দিয়েছে।
বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে কেবল স্থাপনা নয়, প্রচলিত ধারণা, চিন্তা-বিশ্বাস, দর্শন, মূল্যবোধ, গতানুগতিক রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি বহু ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের আবহ সৃষ্টি করেছে। নতুন এক সম্ভাবনা ও শঙ্কার মুখে দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশ, তখন কেউ নির্বাচনেই দেখছেন রাজনৈতিক সমাধান। তবে, জুলাইয়ের চেতনা ও জনাকাঙ্ক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কার, দৃশ্যমান বিচার শুরুর পরই নির্বাচনের পক্ষে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল।

+ There are no comments
Add yours